৪০, কাওরান বাজার । ফোন: ৮১৮৯০১৭-৮
কাজলারপাড়, ডেমরা রোড। ফোন : ৭১২২৬৬০, ৭৫৫৪৯৬০
৯/আই মতিঝিল (বিজ্ঞাপন) ফোন:৭১২২৬৬৪, ৭১২২৬৬৭
e-mail: ittefaq@bangla.net.
dailyittefaq@yahoo.com
USA-Correspondent: shahidulus@gmail.com
লেখক: ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার | রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১২, ২৩ মাঘ ১৪১৮
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে ড. এটিএম শামসুল হুদা নির্বাচন কমিশনের মেয়াদকাল শেষ হবে। নির্বাচন কমিশনের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে ২০০৭ সালে জাতীয় সংকটকালীন সময়ে ড. ফখরুদ্দীন সেনা সমর্থিত জরুরি সরকার আমলে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করায় এ কমিশনকে ধন্যবাদ দেয়া সঙ্গত। এ নিবন্ধে ড. হুদা কমিশনকে ধন্যবাদ দেয়ার আগে কমিশনের পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ডে সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন করতে চাই। স্বল্প পরিসরে যেহেতু এ কমিশনের পাঁচ বছরের ঘটনাবহুল কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বয়ান সম্ভব নয়, সে কারণে সম্মানিত পাঠকদের জন্য কমিশনের ভালো-মন্দের একটি সংক্ষিপ্তসার এ প্রবন্ধে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করবো।
আলোচ্য মূল্যায়নের আগে বলে নেয়া ভালো, বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে প্রত্যাশিত পেশাদারিত্ব গড়ে ওঠেনি। স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে শুরু করে গত ৪০ বছরে যে দশটি নির্বাচন কমিশন এ দেশে কাজ করেছে তাদের প্রায় প্রতিটি কমিশনকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। যুগপত্ সামরিক ও বেসামরিক শাসনামলের এ কমিশনগুলো এদের কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশিত নিরপেক্ষতা, স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্বের প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। এ সময় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কেবলমাত্র সমালোচনাই হয়নি, কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ এনে রাজনৈতিক দল কর্তৃক নির্বাচন কমিশনারদের অপসারণের জন্য আন্দোলন হয়েছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এহেন আন্দোলনের চাপে নির্বাচন কমিশনাররা স্বেচ্ছা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ উত্থাপন শুরু হয় স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে। ওই সময় মুজিব সরকার আমলে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সিইসির বিরুদ্ধে ‘দলীয়’ ভূমিকা পালনের অভিযোগ এনে জাসদ তার পদত্যাগ দাবি করেছিল। এরপর প্রায় প্রতিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরই কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে এবং এসব নির্বাচনের পর পরাজিত দলগুলো ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’, ‘স্থূল কারচুপি’, ‘বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া’, ‘ডিজিটাল কারচুপি’ প্রভৃতি ধরনের অভিযোগ উত্থাপন অব্যাহত রেখেছে, যে প্রক্রিয়া থেকে আলোচ্য ড. হুদা কমিশনও অব্যাহতি পায়নি।
ড. হুদা কমিশনের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করতে গেলে এ কমিশনকে যতটা প্রশংসা করা যায়, সমালোচনা করা যায় তারচেয়ে বেশি। কমিশনের ভালো কাজের মধ্যে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর সহায়তায় একটি ছবি সংবলিত ভোটার তালিকা তৈরি করা, নতুন নির্বাচনী আইন প্রণয়ন করে রাজনৈতিক দলগুলোকে সে আইনের আওতায় আনা, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধন করিয়ে নাম ও সাইনবোর্ডসর্বস্ব দলের সংখ্যা কমানো, নির্বাচনী মনোনয়ন জমাদানকালে শো-ডাউন বন্ধ করা এবং প্রতি বছর রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব কমিশনে জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করা প্রভৃতির উল্লেখ করা যায়। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছুটা হলেও যেমন আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র তৈরি হয়, তেমনি নতুন নির্বাচনী আইন ও কমিশনের আচরণবিধি মেনে নির্বাচন করায় নির্বাচনী প্রচারণা ভঙ্গিমায় সহিংসতা হ্রাস পেয়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষণ সূচিত হয়। তবে এসব ভালো কাজ করার পরও ড. হুদা কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা সমুন্নত করতে পারেনি। স্বল্প পরিসরে আমরা ড. হুদা কমিশনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কতিপয় নমুনা উপস্থাপন করব।
স্বচ্ছ ও কারচুপিমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ছবি সংবলিত ভোটার তালিকার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার্য। বিশেষজ্ঞদের মতে ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করে এরকম ভোটার তালিকা ৩/৪ মাস সময়ে তৈরি করা যায়। কিন্তু সে কাজটি না করে ২০০৭ সালে জাতি যখন জরুরি অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত নির্বাচনের জন্য উদগ্রীব, এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কোন রাজনৈতিক দল বা নাগরিক সমাজের দাবি না থাকা সত্ত্বেও কমিশন ভোটের সঙ্গে সম্পর্কহীন জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির ল্যাপটপযুক্ত দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে নিয়ে একটি অনির্বাচিত সেনা সমর্থিত সরকারকে দুই বছর ক্ষমতায় থাকতে সহায়তা করে দ্রুত নির্বাচন প্রত্যাশী জাতির সঙ্গে প্রতারণা করে। নির্বাচন কমিশন ফুটবল মাঠের রেফারির মত; সব দলের প্রতি কমিশনের সমান আচরণ প্রত্যাশিত। কিন্তু ড. হুদা কমিশন ২০০৭ সালে বিএনপি’র প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করে দলটির ভাঙ্গনে সরাসরি ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আহূত সংলাপে বিএনপি’র বৈধ মহাসচিবকে না ডেকে কতিপয় তথাকথিত সংস্কারবাদী নেতার মধ্যরাতের ষড়যন্ত্রের ফ্যাক্টরিতে সেনা সমর্থিত সরকারের আনুকূল্যে জন্ম নেয়া স্বঘোষিত বিএনপি’র মহাসচিবকে বিএনপি গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ ফর্মুলায় আমন্ত্রণ জানিয়ে কমিশন অমার্জনীয় অপরাধ করে। ওই সময় দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের যুক্তিসঙ্গত কারণে বিএনপি চেয়ারপার্সন দলীয় মহাসচিবকে বহিষ্কার করলে সিইসি মহোদয় বেগম জিয়ার সমালোচনা করে তাঁর এ কাজকে ‘অন্যায়’ এবং ওই মনোভাবকে ‘স্বৈরাচারী’ হিসাবে আখ্যায়িত করলেও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জনাব আবদুল জলিল বিদেশ থেকে চিকিত্সা শেষে দেশে ফিরে নিজ পদে যোগ দিতে ব্যর্থ হয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর নির্দেশে অনিচ্ছাকৃত বিশ্রাম নিতে বাধ্য হলেও সিইসি মহোদয় সে কাজের নিন্দা না করে একচোখা রেফারির ভূমিকা পালন করেন।
ড. হুদা কমিশন ২০০৭ সালে শুরু করা ভোটার নিবন্ধনের কাজ ২০০৮ সালের জুলাই মাসে শেষ হবার পর খুশি হয়ে এক ব্যতিক্রমি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে অন্য সবাইকে আমন্ত্রণ জানালেও যারা সিইসি’র ভাষায় ‘কমিশনের প্রধান ক্লায়েন্ট’, যাদের জন্য ভোটার তালিকা এবং যারা ওই তালিকার ব্যবহারকারী, সেই রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ না করায় একজন কলামিস্ট কমিশনের ওই অনুষ্ঠানকে ‘বর-বধূ ছাড়া বিয়ে’ বলে সমালোচনা করেন। কমিশন নির্বাচনী আইন সংস্কার প্রক্রিয়ায় সুশীল সমাজ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করার প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে দেশের নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাচনের ওপর চিন্তা-ভাবনা ও প্রকাশনাকারীদের মধ্য থেকে ওই সদস্য চয়নের কথা বলে বাস্তবে কেবলমাত্র ঢাকায় বসবাসকারী ও এনজিও সংযোগধারী কমিশনের কিছু বাছাইকৃত সম্মানিত ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সুশীল সমাজ সদস্য হিসাবে আলোচানা করে সমালোচিত হয়। কমিশন আরও সমালোচিত হয় একেক দলের সঙ্গে একেকরকম আচরণ করে।
নির্বাচনী আইন সংস্কারের লক্ষ্যে ২০০৭ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপকালে কমিশনের এ পক্ষপাতদুষ্টতা ধরা পড়ে। ওই সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সংলাপের সূচনা বক্তব্যে সিইসি মহোদয় বলেন, ‘আজকের কেয়ারটেকার সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন আপনাদেরই আন্দোলনের ফসল। আপনারা স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন আপনারা।’ একই সংলাপে আর একজন ইসি কমিশনার এভাবে বিনয়ে বিগলিত হন: ‘আপনারা যখন রাজনীতি শুরু করেছেন তখন আমি শিশু। আপনাদের সামনে রাজনীতি নিয়ে কথা বলা আমার পক্ষে এক ধরনের ধৃ্ষ্টতা।’ অন্যান্য দলের সঙ্গে সংলাপকালে কমিশন একইরকম বিনয় ও ভদ্রতা প্রদর্শন করলে একে তোষামোদি না বলে কমিশনের পেশাদারিত্বের উন্নতি ও শিষ্টাচার বলে প্রশংসা করা যেত। জরুরি অবস্থায় কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে তা বুঝতে অক্ষম বলে বক্তব্য প্রদানকারী সিইসিই আবার ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীন সরকার আমলে জরুরি সরকারের অধীনে কতিপয় সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচন করে নিন্দিত হন। নবম সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে কমিশন ঘটা করে যে নির্বাচনের পথনকশা প্রকাশ করে ওই পথনকশা অনুযায়ী একটি কাজও সময়মত সম্পন্ন করতে না পারার মধ্যে কমিশনের ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা বিধৃত হয়।
নবম সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিলগ্নে রিটার্নিং অফিসারদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সিইসি মহোদয় দেশে কতিপয় ভালো নির্বাচনের উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মত নির্বাচন করতে চেয়ে সমালোচিত হন। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এনজিওদের স্বেচ্ছাচারিতা রোধেও কমিশন ব্যর্থ হয়। রাজনৈতিক ভূমিকা পালনকারী অনেক কালো তালিকাভুক্ত এনজিও এশিয়া ফাউন্ডেশনের টাকায় পুনরায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি পায়। কমিশন এনজিও জোট ইডব্লিউজিভুক্ত এনজিওগুলোকে দিয়ে ছবি সংবলিত ভোটার তালিকা তৈরি প্রক্রিয়ায় ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ কাজ করাবার পর নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ওই একই এনজিওগুলোকে নির্বাচন কমিশন আয়োজিত নবম সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার অনুমতি দিয়ে সমালোচিত হয়। কমিশন আয়োজিত ভোলা-৩ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব এবং সহিংসতা এমনই উচ্চতায় পৌঁছে যে, প্রফেসর মোজাফফর আহমদকে বলতে হয়, ‘ভোলা-৩ আসনের উপনির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থীর বিজয় হলেও গণতন্ত্র পরাজিত হয়।’ সিসিসি নির্বাচনে আচরণবিধি ভঙ্গ করার কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কাউন্সিলর প্রার্থীকে আর্থিক জরিমানা করতে পারলেও একই দোষে অভিযুক্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সম্মানিত বিরোধীদলীয় নেত্রীকে কমিশনের মৃদু ভাষায়ও সমালোচনা করতে না পারা এর মেরুদণ্ড দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। কমিশনের অধীনে আইন-শৃংখলা বাহিনীর ২২ হাজার সদস্য কর্তব্যরত থাকা অবস্থায় ওই নির্বাচনের ভোট গণনাকালে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতাকর্মীদের মধ্যকার সংঘর্ষে ১০ জন আহত হওয়ার মধ্যে কমিশনের ব্যবস্থপনা ব্যর্থতা ধরা পড়ে।
ড. হুদা কমিশন এর স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে অনেক সময় নির্দেশিত হয়ে চাপের মধ্যে কাজ করে। ২০১১ সালের জুলাই মাসে কমিশনের সঙ্গে সংলাপকালে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর জনৈক প্রেসিডিয়াম সদস্য ২০০৭ সালে তার দলকে নিবন্ধনের ব্যাপারে কমিশন কর্তৃক হয়রানি করার অভিযোগের জবাবে সিইসি মহোদয় ওই ঘটনার সাড়ে চার বছর পর ফখরুদ্দীন সরকার আমলে চাপের মধ্য থেকে কাজ করার কথা স্বীকার করেন। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে কমিশন বিশেষ সতর্কতা গ্রহণ না করায় কক্সবাজার এবং কুমিল্লা এলাকার ভোটার তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশি ভোটার হতে পারে। কমিশনের সম্মানিত সদস্যরা ‘রাজনৈতিক’ ও ‘লাগামছাড়া’ বক্তব্য প্রদানেও সাফল্য দেখান। গণতান্ত্রিক সমাজে মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়া কোন অপরাধ বা অপ্রচলিত বিষয় নয় এবং এ দেশেও সরকারের মেয়াদপূর্তির আগে একাধিকবার মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়েছে। আগামীতে যে তেমনটি হবে না তা বলা না গেলেও সিইসি মহোদয় তাঁর একাধিক বক্তব্যে ২০১৪ সালেই সংসদ নির্বাচন হবে বলে বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত হন। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে ২ সহস্রাধিক সংঘর্ষে ৬৬ জন নিহত এবং ৮ সহস্রাধিক আহত হওয়ার পর ইসি কমিশনার মোহাম্মদ ছহুল হোসাইন হাস্যকরভাবে ওই নির্বাচনকে শতকরা ৯৮ ভাগ সফল এবং ২ ভাগ খারাপ বলে বক্তব্য দেন। ওই নির্বাচনে কমিশনে জমা পড়া হাজার হাজার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি ‘পড়েও দেখি না’ বলে মন্তব্য করে কমিশনের পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতা ভূলুণ্ঠিত করেন। পাঁচ বছরে ডিসিসি নির্বাচন না করতে পারার ব্যর্থতা ও লজ্জা নিয়েই ড. হুদা কমিশনকে এর আয়ুষ্কাল শেষ করে বিদায় নিতে হয়।
নাসিক নির্বাচনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েনের জন্য সরকারকে লিখিত অনুরোধ জানাবার পরও ওই নির্বাচনে সেনা মোতায়েন না করে সরকার যে সংবিধানের ১২৬ ধারা লঙ্ঘন করে সে বিষয়টি সিইসি গণমাধ্যমে স্বীকার করার পরও এ ব্যাপারে আদালতে না গিয়ে বা নির্বাচন স্থগিত না করে কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। রাজনৈতিক দলগুলো না চাইলেও কমিশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখিয়ে জনমনে সন্দেহ জন্ম দেয়।
যারা ইভিএম-এর বিরোধিতা করছেন তারা নির্বাচনে কারচুপি করতে চান বলে বক্তব্য দিয়ে ইসি কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বিতর্কিত হন। পৃথিবীর অনেক দেশ যখন নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইভিএম ব্যবহার থেকে সরে আসছে সেখানে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও ইসির এ ব্যাপারে বেশি আগ্রহ দেখানো জনমনে সন্দেহ তৈরি করে। কারচুপির ঝুঁকি নিয়ে ইভিএম-এ নির্বাচন করতে অনেক দল রাজি না হলেও ইসি যেন ইভিএম-এ নির্বাচন করতে মরিয়া। সিইসি মহোদয় ইভিএম ব্যবহার করে অর্থ সাশ্রয়ের অঙ্ক কষে দেখান, ইভিএম ব্যবহার করে সরকারের অনেক অর্থের সাশ্রয় হবে। কিন্তু দেশবাসী যে নির্বাচন কমিশনকে অর্থ সাশ্রয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে না দেখে নির্বাচনে স্বচ্ছতা সুনিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখতে চান সে বিষয়টিই কমিশনকে গুরুত্ব দিতে দেখা যায় না। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের দুর্নীতিবাণিজ্য, ইসি কর্মকর্তাদের গেজেটবাণিজ্য এবং ইসি মাঠ কর্মকর্তাদের ভোটার তালিকার সিডিবাণিজ্যকেন্দ্রিক দুর্নীতি রোধে কমিশন মোটেও সাফল্য দেখাতে পারেনি। এর সাথে ড. হুদা কমিশনের আয়ুষ্কালের শেষপ্রান্তে এসে নির্বাচন কর্মকর্তাদের গণবদলি এবং মাঠ পর্যায় থেকে কর্মকর্তাদের ইসি সচিবালয়ে বদলি করে আনার মধ্যে কোন উদ্দেশ্য আছে কিনা সে বিষয়েও কমিশন জনমনের সন্দেহ দূর করেনি। এসব কিছু মিলিয়ে ড. হুদা কমিশনের পাঁচ বছরের আমলনামার সতর্ক পরীক্ষার পর বলা যায়, কমিশন নাগরিক সমাজের আস্থা অর্জন করতে পারেনি।
তাহলেও সরকারি দলের নেতাকর্মী এবং সরকার সমর্থক কিছু বুদ্ধিজীবী কমিশনের প্রশংসা করছেন। এমন একজন একাডেমিক একটি জাতীয় দৈনিকে লিখিত প্রবন্ধে এ ‘কমিশনের গায়ে সাফল্যের অনেক সুবর্ণ পালক শোভা পাচ্ছে’ (প্রথম আলো ২৯-০৯-২০১১) বলে মন্তব্য করলেও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের পর ওই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া যায় না। আমাদের পর্যবেক্ষণে মনে হয়, কমিশনের গায়ের দু’একটি সাদা পালক এর শরীরের অনেক কালো দাগের নীচে চাপা পড়ে গেছে। তারপরও ভালে-মন্দ মিলিয়ে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করার জন্য ড. হুদা কমিশনকে ধন্যবাদ জানাই। যে বিষয়টি বলে এ নিবন্ধ শেষ করবো তা হল, উন্নয়নের জন্য আত্মসমালোচনা জরুরি। এ নিবন্ধ রচনার উদ্দেশ্য কোন বিশেষ নির্বাচন কমিশনকে সমালোচনা বা কটাক্ষ করা নয়। এর লক্ষ্য হল, আগামী নির্বাচন কমিশন যাতে ড. হুদা কমিশনের ভালো-মন্দ ও ভুল-ত্রুটি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এর নিরপেক্ষতা, স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব সুনিশ্চিত করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকে টেকসই করতে অবদানমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে সে ব্যাপারে নতুন নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা। কিন্তু নতুন কমিশন গঠনের জন্য আইন তৈরির সুযোগ ব্যবহার না করে প্রজ্ঞাপন জারি করে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সরকারের বেতনভুক অনির্বাচিত কর্মকর্তাদের নিয়ে সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছে তাতে এ প্রক্রিয়ায় গঠিত নতুন কমিশন কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে এবং কি পরিমাণ নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করতে পারবে তা দেখার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক :অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। akhtermy@gmail.com
মেয়াদ উত্তীর্ণ পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?
পূর্বের রেজাল্ট দেখতে ক্লিক করুন
মন্তব্য
এখানে কোন মন্তব্য নাই।