box1

হোমarrow_menu প্রথম পাতাarrow_menu ভেজাল ওষুধের আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ প্রশাসন

ভেজাল ওষুধের আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ প্রশাসন

লেখক: আবুল খায়ের  |  বৃহস্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০১২, ২০ মাঘ ১৪১৮

রোগীর মৃত্যুতে উদ্বিগ্ন চিকিত্সকরা

দেশে আকাশ ও স্থল পথে ব্যাপক হারে আসছে জীবন রক্ষাকারী নকল ও ভেজাল ওষুধ। নিম্নমানের এসব ওষুধ সেবনে মৃত্যুর হার বেড়ে চললেও এই নিয়ে কোন মনিটরিং নেই। ফলে নীরবে চলছে মৃত্যুর মিছিল। জানা গেছে, বাজারজাতকৃত ওষুধের ৯০ ভাগই নিম্নমান ও ভেজাল। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৪০টি এ্যালোপ্যাথিক কোম্পানির উত্পাদিত ওষুধের গুণগত মান ভাল। কোন কোন কোম্পানির ওষুধ আন্তর্জাতিকমানের বলে অধিদফতর সূত্রে বলা হয়। সংসদীয় কমিটিও এ্যালোপ্যাথিক কোম্পানির ওষুধের কারখানা পরিদর্শন করে অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করেছে। বাকি কোম্পানিগুলোর তৈরি ওষুধের গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন অধিদফতরের কর্মকর্তাদের। পাকিস্তান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নিষিদ্ধ ওষুধ চোরাই পথে নিয়মিত আসছে। অথচ তার নিয়ন্ত্রণ নেই। এদেশে ওষুধের বাজার ভেজাল নিম্নমান ওষুধ উত্পাদন ও বাজারজাতকারীদের কাছে জিম্মি। এই সকল নিম্নমান ও ভেজাল ওষুধের মার্কেট গ্রামাঞ্চলে। ইতিমধ্যে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে ভেজাল ওষুধ খেয়ে শতাধিক রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এদেশে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ প্রকাশ্যে মুড়ি মুড়কির মত বিক্রি হলেও তা নিয়ে প্রশাসনের মাথা ব্যথা নেই। সম্প্রতি  প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে তিন শতাধিক শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এই নিয়ে প্রশাসন কিছুদিন অস্থির ছিল। এরপর আর কোন তত্পরতা নেই। এদেশে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ কিংবা খাদ্যসামগ্রী খেয়ে মারা গেলে বিচারের নজির নেই। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রশাসনের কিংবা সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উত্পাদনকারীদের      কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অংকের উেকাচ পান।  ফলে নিম্নমান, ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ উত্পাদনের উত্স অনেক গুণ বেড়ে গেছে।  নিম্নমান ও ভেজাল ওষুধ খেয়ে কিডনি, লিভারসহ মরণ ও জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে কিংবা তাত্ক্ষণিকভাবে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর মৃত্যু হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানিয়েছেন। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায় আগত রোগীদের মধ্যে প্রতি মাসে মৃত্যুর হার দ্বিগুণ বাড়ছে। অনেকের সঙ্গে চিকিত্সকরা আলাপ করে ও রোগের উপসর্গে নিশ্চিত হন যে, তাদের বেশির ভাগ মৃত্যুর জন্য ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ দায়ী।

কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির এক কর্মকর্তা গতকাল বুধবার ইত্তেফাককে বলেন, পাকিস্তান থেকে নিষিদ্ধ ওষুধ এদেশে বিপুল পরিমাণে আসছে। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ খেয়ে পাকিস্তানে শতাধিক রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে। প্রতি মাসে অনেক রোগী ঐ সকল ওষুধ খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। তবে এদেশে পাকিস্তানের নিষিদ্ধ ওষুধ খেয়ে কত রোগীর মৃত্যু হয়েছে এর কোন হিসাব নেই বলে উক্ত কর্মকর্তা জানান। বিমানযোগে ও স্থল পথে বিনা বাধায় নিষিদ্ধ ঘোষিত নিম্নমান ও ভেজাল ওষুধ কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চোখের সামনে পাচার হয়ে আসছে। জানা যায়, চোরাকারবারীরা ঐ সকল কর্মকর্তাদের নির্ধারিত হারে মাসোহারা দিয়ে থাকে। এ কারণে নিরাপদেই এই সকল নিষিদ্ধ ওষুধ দেশে প্রবেশ করে।  এসবের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ব্যবহার্য ওষুধও রয়েছে।

ওষুধ প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, এদেশে ২৬৭টি এ্যালোপ্যাথিক কোম্পানির মধ্যে প্রায় ৪০টির ওষুধের গুণগতমান উন্নত এর মধ্যে ২০টি কোম্পানির ওষুধের অবস্থান আন্তর্জাতিক মানের। বাকি ২২৭টি কোম্পানির উত্পাদিত ওষুধ বাজারজাত হলেও এ ব্যাপারে কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। রাজধানীতে এই সকল কোম্পানির নিম্নমান ও ভেজাল ওষুধ বাজারজাত করে না। অথচ গ্রামাঞ্চলে প্রকাশ্যে ঐ সকল কোম্পানির ওষুধ ব্যাপকহারে বেচাকেনা চলছে। এছাড়া হোমিওপ্যাথিক ৭৯টি, ইউনানী ২৭০টি, আয়ুর্বেদিক ১৬৮টি ও হারবাল ৯টি কোম্পানির উত্পাদিত ওষুধ ও তা বাজারজাত নিয়ে মনিটর করা ওষুধ প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের ভাষায়, অনেক কোম্পানি কথিত যৌন উত্তেজনা বর্ধক হরেক নামের বিপজ্জনক ওষুধ তৈরি করে বাজারজাত করছে। তারা জানান, এ্যালোপ্যাথিকসহ মোট ৭৯৩টি কোম্পানি ওষুধ উত্পাদন ও বাজারজাত করছে। এই বিশাল ওষুধ মার্কেটের মধ্যে ওষুধ প্রশাসনের অবস্থা মহাসমুদ্রের মধ্যে একটি ছোট ঘর। এরপর জনবল নেই। পরীক্ষাগারের অবস্থা আরো করুণ। এই ব্যবস্থার মধ্যে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের রাজ্যে আসল ওষুধ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব বলে উক্ত কর্মকর্তারা জানান।

সম্প্রতি সংসদীয় কমিটি এদেশে উত্পাদিত ২৬৭টি এ্যালোপ্যাথিক কোম্পানির কারখানা সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখে, প্রায় ৪০টি কোম্পানির ওষুধ উত্পাদনে অবকাঠামোগত  কোন ঘাটতি নেই এবং তারা ভাল ওষুধ তৈরি করছে। বাকি কোম্পানিগুলোর গুণগতমানের ওষুধ উত্পাদনে তার ঘাটতি রয়েছে অনেক। সংসদীয় কমিটি জানায়, এরাই ওষুধের নামে বিষ তৈরি করে বাজারজাত করছে। অবশেষে সংসদীয় কমিটি ঘাটতিপূরণ সাপেক্ষে গুণগতমানের ওষুধ উত্পাদন করে বাজারজাতের সুপারিশ করলেও তারা আগের মতই ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ উত্পাদন করে গ্রামাঞ্চলে বাজারজাত চালিয়ে আসছে বলে জানা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, মহামারি আকারে বিষাক্ত, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ এবং খাদ্যসামগ্রী খেয়ে আশংকাজনক হারে প্রাণহানির ঘটনা  দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। বর্তমান সরকার শত কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি সম্প্রসারণ এবং অত্যাধুনিক করার কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই ল্যাবরেটরিতে ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যসামগ্রী পরীক্ষা করা সম্ভব। উত্পাদিত কোম্পানিগুলোর পণ্য নির্ধারিত ফি নিয়ে গুণগতমান পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রাখা হলে বছরে হাজার কোটি টাকা আয় হবে। এতে বাড়তি জনবলেরও প্রয়োজন নেই। ফলে ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রীর মান নিয়ন্ত্রণ সরকারের আওতার মধ্যে থাকবে বলে তিনি জানান।

বিশিষ্ট লিভার বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. মবিন খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ এবং চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এন হুদা বলেন, বার বার ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ পরিবর্তন করতে হয়।  কোন ওষুধে রোগ প্রতিরোধ হয় এ নিয়ে চিকিত্সকরা বিপাকে। রোগীরা এসে বলেন, স্যার ওষুধে কাজ হয় না। অনেক রোগী এন্টিবায়োটিকসহ নানা ধরনের ওষুধ সেবনে জটিল অবস্থায় আসেন। তাতে নিম্নমান ও ভেজাল ওষুধ খেয়ে আসার প্রমাণ পাওয়া যায়।

এমন অবস্থায় আগে চিকিত্সা দিয়ে লাভ হয় না। গ্রামাঞ্চল থেকে কিডনিসহ বেশিরভাগ জটিল ব্যাধি নিয়ে রোগী আসছেন। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ না করলে রোগীর মৃত্যু মহামারি আকার ধারণ করার আশংকা রয়েছে। বর্তমানে রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চলে রোগীদের মৃত্যুর হার বেড়ে গেছে বলেও উক্ত বিশেষজ্ঞগণ অভিমত ব্যক্ত করেন।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হানিফ বলেন, শুধু তার অধীনে ১৯৯২ সালে প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে তিন শতাধিক শিশু মৃত্যুর ঘটনা ধরা পড়ে। ২০০৯ সালে ২৭ জন শিশুর একই কারণে মৃত্যুর ঘটনা ধরা পড়ে। অথচ এই বিষয় নিয়ে কি হচ্ছে, তা ওষুধ প্রশাসন জানে বলে তিনি জানান।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ নিয়ন্ত্রণে তাদের কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চলছে। নিম্নমান ও ভেজাল ওষুধের মাত্রা বেড়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চলছে। জনবল বৃদ্ধি করা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

 

 

 

 

মন্তব্য

এখানে কোন মন্তব্য নাই।

আপনার মন্তব্য:





পুরোনো সংখা

<< ফেব্রুয়ারী ২০১২ >>
শনিবাররবিবারসোমবারমঙ্গলবারবুধবারবৃহস্পতিবারশুক্রবার
    
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯  

১৪ই এপ্রিলের পূর্বের আর্কাইভ

ইত্তেফাক আর্কাইভ

মানিক মিয়া

  • The Daily Ittefaq
  • RSS Feed
  • TechnoFusion
  • অনলাইন জরিপ

    মেয়াদ উত্তীর্ণ পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?

    • হ্যাঁ ০%
    • না ০%
    • মন্তব্য নেই ০%

    পূর্বের রেজাল্ট দেখতে ক্লিক করুন

     

    4.99MB 0.3558